
মহামায়াতলা, আমার কলকাতা: দুর্গাপুজো মানেই শুধু আলোর রোশনাই, চোখধাঁধানো মণ্ডপ কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন নয়। দুর্গাপুজোর আসল শিক্ষা হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, নারীশক্তিকে সম্মান করা এবং সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখা। মহাপঞ্চমীর সন্ধ্যায় এমনই এক সুন্দর বার্তা উঠে এল মহামায়াতলার সুগম সুধীর আবাসনের দুর্গোৎসবের মঞ্চ থেকে।
এবারের দুর্গাপুজোর বিশেষ আকর্ষণ ‘মহামায়ার রাজদালান’ থিম। এই থিমের উদ্বোধন করে উপস্থিত আবাসিক ও ভক্তদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন ভারত সেবাশ্রম সংঘের আচার্য বিভুক্তানন্দজী। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে দেবী দুর্গার মাহাত্ম্য, সনাতন ধর্মের দর্শন, নারীশক্তির গুরুত্ব, দেশপ্রেম এবং একটি আদর্শ সমাজ গঠনের নানা দিক।
নিরাকার ব্রহ্ম থেকে দেবীর সাকার রূপ, ব্যাখ্যায় আচার্য বিভুক্তানন্দজী
বক্তব্যের শুরুতেই আচার্য বিভুক্তানন্দজী ব্যাখ্যা করেন, পরম ব্রহ্মকে নিরাকার বলা হলেও ভক্তরা নিজেদের ভালোবাসা ও ভক্তির মাধ্যমে তাঁকে সাকার রূপে কল্পনা করেন। সনাতন ধর্মে নিরাকার ও সাকার—দুই ধরনের উপাসনারই গুরুত্ব রয়েছে।
উপনিষদ ও চণ্ডীর বিভিন্ন কাহিনি তুলে ধরে তিনি বোঝান, মানুষের শক্তি যতই থাকুক না কেন, তার পিছনে একটি বৃহত্তর শক্তির ভূমিকা রয়েছে। দেবতাদের অহংকার ভাঙার কাহিনির মাধ্যমে তিনি বলেন, নিজের ক্ষমতা নিয়ে গর্ব না করে সেই শক্তির প্রকৃত উৎসকে উপলব্ধি করা উচিত।
মহিষাসুর বধের কাহিনি থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শিক্ষা
দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের প্রসঙ্গ তুলে আচার্য বিভুক্তানন্দজী বলেন, যখন অশুভ শক্তি প্রবল হয়ে ওঠে এবং সমাজে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তখন শুভশক্তির জাগরণ প্রয়োজন। দেবী দুর্গার আবির্ভাব সেই শুভশক্তিরই প্রতীক।
তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা, অন্যায় ও অত্যাচারের কাছে মাথা নত করা উচিত নয়। সমাজে ন্যায়, শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য সকলকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।
নারীকে সম্মান করাই প্রকৃত সংস্কৃতির পরিচয়
অনুষ্ঠানে নারীশক্তির মর্যাদার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। আচার্য বিভুক্তানন্দজী বলেন, ভারতীয় সংস্কৃতিতে নারীকে শুধু পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে দেখা হয় না, তাঁকে শক্তি, সৃষ্টি ও মাতৃত্বের প্রতীক হিসেবেও সম্মান করা হয়।
মহাভারতের ‘যত্র নার্যস্তু পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ’ শ্লোকের উল্লেখ করে তিনি বোঝান, যে পরিবার ও সমাজে নারীরা যথাযথ সম্মান পান, সেখানে কল্যাণ ও শান্তির পরিবেশ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বেশি।
দেবী দুর্গার আরাধনার মধ্য দিয়ে নারীর প্রতি সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তার বার্তাকে বাস্তব জীবনেও অনুসরণ করার আহ্বান জানান তিনি।
দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বাঙালির আবেগ
বাংলার দুর্গাপুজোর বিশেষত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আচার্য বিভুক্তানন্দজী বলেন, এখানে দেবী দুর্গা শুধু একা আসেন না, তিনি সপরিবারে আসেন। বাঙালির কাছে এটি যেন ঘরের মেয়ের বাপের বাড়িতে ফিরে আসার আনন্দ।
এই পারিবারিক আবেগই দুর্গাপুজোকে অন্য মাত্রা দেয়। পুজো হয়ে ওঠে আত্মীয়তা, মিলন, আনন্দ ও সম্প্রীতির উৎসব। তাই এই উৎসবে জাতি, ধর্ম বা সামাজিক অবস্থানের ভেদাভেদ ভুলে সকলের অংশগ্রহণ করা উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
আদর্শ সমাজ গড়তে চাই শিক্ষা, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা
দেবী দুর্গার সঙ্গে গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও কার্তিকের উপস্থিতির প্রতীকী ব্যাখ্যাও দেন আচার্য বিভুক্তানন্দজী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই পারিবারিক রূপের মধ্যেও সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।
গণেশকে মানবসম্পদের গুরুত্ব, লক্ষ্মীকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সরস্বতীকে জ্ঞান ও শিক্ষার এবং কার্তিককে সুরক্ষা ও নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেন তিনি।
একটি আদর্শ সমাজ গড়তে শুধু অর্থ থাকলেই চলবে না; প্রয়োজন শিক্ষার প্রসার, মানুষের উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধ। এই সমস্ত বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য থাকলেই সমাজ এগিয়ে যেতে পারে।
দেশপ্রেম ও মাতৃভূমির প্রতি দায়িত্বের বার্তা
বক্তব্যে দেশপ্রেমের প্রসঙ্গ তুলে আচার্য বিভুক্তানন্দজী ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী’ শ্লোকের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নিজের মা ও মাতৃভূমির প্রতি দায়িত্ববোধ থাকা প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য।
দেশের ঐক্য, অখণ্ডতা ও সমৃদ্ধি রক্ষায় সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়িত্ববোধের যোগসূত্রও তিনি তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত ও ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশনের সময় সকলকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি।
আড়ম্বর নয়, ভক্তিই পুজোর আসল শক্তি
দুর্গাপুজোর বাহ্যিক আয়োজন প্রসঙ্গে আচার্য বিভুক্তানন্দজী বলেন, সুন্দর মণ্ডপ, আলোকসজ্জা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উৎসবের আকর্ষণ বাড়ায় ঠিকই, কিন্তু পুজোর প্রকৃত সার্থকতা শুধু এগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
পুজোর মূল ভিত্তি হলো শ্রদ্ধা, ভক্তি, সংযম ও আন্তরিকতা। ফুল, বেলপাতা, ফল কিংবা মিষ্টি দিয়ে পুজো করা হলেও তার সঙ্গে ভক্তির অনুভূতি থাকা জরুরি। শুধু আয়োজন বড় হলেই পুজো সুন্দর হয় না; মানুষের মনেও যদি শ্রদ্ধা ও শুভবোধ থাকে, তবেই উৎসবের প্রকৃত অর্থ পূর্ণতা পায়।
তিনি আবাসনের বাসিন্দাদের উদ্দেশে বলেন, প্রত্যেকের উচিত নিজেদের পরিবারের মঙ্গল কামনার পাশাপাশি সমাজের সকল মানুষের কল্যাণের কথাও ভাবা।
‘মহামায়ার রাজদালান’-এ সম্প্রীতি ও কল্যাণের প্রত্যাশা
মহামায়াতলার সুগম সুধীর আবাসনের এবারের দুর্গাপুজোর থিম ‘মহামায়ার রাজদালান’। এই বিশেষ আয়োজনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আচার্য বিভুক্তানন্দজীর বক্তব্যে ধর্মীয় দর্শনের পাশাপাশি উঠে আসে মানবিক মূল্যবোধ, নারীসম্মান, শিক্ষা, দেশপ্রেম ও সামাজিক সম্প্রীতির কথা।
দুর্গাপুজোকে ঘিরে আবাসনের বাসিন্দাদের মিলন এবং উৎসবের আনন্দের মধ্য দিয়ে সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বানও ছিল তাঁর বক্তব্যে।
দেবী দুর্গার আরাধনায় সকলের জীবনে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি আসুক—এই প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শারদোৎসবের বার্তা হয়ে উঠল ভক্তি, ঐক্য ও মানবকল্যাণের আহ্বান।
