
স্বপন কুমার মন্ডল, আমার কলকাতা: প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে আচমকা দুর্ঘটনা—জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারকাজে নামতে পশ্চিমবঙ্গে গড়ে উঠল বিশেষ প্রশিক্ষিত বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ‘অর্জুন বাহিনী’। মঙ্গলবার নবান্নে আনুষ্ঠানিক ভাবে এই বাহিনীর সূচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
রাজ্য সরকারের বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা ও অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতরের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই বাহিনীর মূল লক্ষ্য, বিপর্যয়ের ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এর মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণকাজ শুরু করা। প্রথম পর্যায়ে রাজ্য সৈনিক বোর্ডের মাধ্যমে বাছাই করা ২০০ জন অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মীকে নিয়ে বাহিনীটি তৈরি হয়েছে। তাঁদের বয়স ৪০ বছরের মধ্যে। বাহিনীর সদস্যদের পরিচয় হবে ‘বীর’, আর নেতৃত্বে থাকা সদস্যদের বলা হবে ‘বীরনায়ক’।
কলকাতা, পাহাড় ও সুন্দরবনে প্রাথমিক মোতায়েন
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০০ সদস্যের মধ্যে ১০০ জন কলকাতায়, ৫০ জন দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের পাহাড়ি এলাকায় এবং বাকি ৫০ জন সুন্দরবন অঞ্চলে মোতায়েন থাকবেন। প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁরা সংশ্লিষ্ট এলাকার বাইরেও উদ্ধারকাজে যেতে পারবেন।
আগামী দিনে দিঘা, মন্দারমণি, মুকুটমণিপুর, তারাপীঠ এবং তরাই-ডুয়ার্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও পর্যটনকেন্দ্রগুলিতেও এই বাহিনীর কন্টিনজেন্ট রাখার পরিকল্পনা রয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন।
এনডিআরএফের ধাঁচে প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সরঞ্জাম
রাজ্যের নতুন এই বাহিনীকে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা এনডিআরএফের ধাঁচে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। উদ্ধারকাজে প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ ও পরিকাঠামোর উপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে।
রাজ্য সরকারের বক্তব্য, ভূমিকম্প, ভূমিধস, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভবন ধস কিংবা অন্যান্য বড় দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুততার সঙ্গে প্রশিক্ষিত কর্মীদের ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেওয়াই এই বাহিনীর অন্যতম লক্ষ্য।
‘বীর’ ও ‘বীরনায়ক’-দের জন্য আর্থিক সুবিধা
বাহিনীর সদস্যদের জন্য সম্মানিকও নির্ধারণ করা হয়েছে। ‘বীর’রা মাসে ২৫ হাজার টাকা এবং ‘বীরনায়ক’রা ৪০ হাজার টাকা করে পাবেন। প্রতি বছর ৩ শতাংশ হারে সম্মানিক বৃদ্ধির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দায়িত্ব পালনকালে প্রাণহানি বা গুরুতর শারীরিক অক্ষমতার ক্ষেত্রে আর্থিক সুরক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে।
অগ্নিবীরদেরও যুক্ত করার পরিকল্পনা
‘অর্জুন বাহিনী’কে আরও শক্তিশালী করতে আগামী দিনে অগ্নিবীরদেরও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে প্রথম ব্যাচের অগ্নিবীরদের পাওয়া যাবে। তাঁদের পাশাপাশি পুলিশ, দমকল, বন দফতর এবং বিপর্যয় ব্যবস্থাপনার মতো বিভিন্ন শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীতে অগ্নিবীরদের জন্য ২০ শতাংশ পদ সংরক্ষণের পরিকল্পনাও জানানো হয়েছে।
‘আপদামিত্র’ প্রকল্পও দ্রুত চালুর উদ্যোগ
অনুষ্ঠানে মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়াল জানান, কেন্দ্রীয় সরকারের ‘আপদামিত্র-২’ প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় যুবকদের বিপর্যয় মোকাবিলার প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশিক্ষণের পর মূল্যায়ন ও শংসাপত্র দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে।
রাজ্য সরকারের আশা, ‘অর্জুন বাহিনী’ এবং প্রশিক্ষিত স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী—দুইয়ের সমন্বয়ে বিপর্যয়ের সময় দ্রুত উদ্ধারকাজ আরও কার্যকর হবে।
বিপর্যয় মোকাবিলায় নতুন পরিকাঠামোর বার্তা
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এত দিন রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা ব্যবস্থায় জনবল, প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পরিকাঠামোর ঘাটতি ছিল। সেই ঘাটতি পূরণ করতেই ‘অর্জুন বাহিনী’ গড়ার সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে সুন্দরবনের মতো ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকা এবং দার্জিলিং-কালিম্পংয়ের মতো পাহাড়ি অঞ্চলে দ্রুত উদ্ধারকারী দল পৌঁছে দেওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাজ্যের পরিকল্পনা, ধাপে ধাপে এই বাহিনীর পরিকাঠামো ও সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব শক্তিশালী বিপর্যয় মোকাবিলা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
#অর্জুনবাহিনী #বিপর্যয়মোকাবিলা #দুর্যোগব্যবস্থাপনা #শুভেন্দুঅধিকারী #কলকাতা #সুন্দরবন #দার্জিলিং #কালিম্পং #অগ্নিবীর