
আমার কলকাতা | কলকাতা: শহর ও রাজ্যের পুর এলাকাগুলিকে আরও পরিচ্ছন্ন করে তুলতে নতুন করে কড়া পদক্ষেপ শুরু করল রাজ্য নগরোন্নয়ন দফতর। পয়লা সেপ্টেম্বর থেকে রাস্তায় ময়লা ফেলা, প্রকাশ্যে প্রস্রাব বা মলত্যাগ, থুতু ফেলা এবং ১২৫ মাইক্রনের কম পুরু নিষিদ্ধ প্লাস্টিক ব্যবহার করলে ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে জরিমানা আদায়ই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য নয়, বরং নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাই প্রধান উদ্দেশ্য—জানালেন দফতরের কর্তারা।
বুধবারের সাংবাদিক বৈঠকে দফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন পুর এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে জরিমানা আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর জন্য বিশেষ অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে। অনুমোদিত পুরকর্মীদের মোবাইলে সেই অ্যাপ ইনস্টল করা হয়েছে।
ছবি তুলে অ্যাপে তথ্য, QR কোডে জরিমানা
কী ভাবে কাজ করবে এই ব্যবস্থা? দফতরের আধিকারিক নবীন চন্দ্র জানান, কোনও ব্যক্তি রাস্তায় ময়লা ফেললে বা নির্দিষ্ট কোনও নিয়ম ভাঙলে প্রথমে ঘটনার ছবি তোলা হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম, মোবাইল নম্বর ও ঠিকানা নথিভুক্ত করে কী ধরনের অপরাধ হয়েছে, তা অ্যাপে নির্বাচন করা হবে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী জরিমানার পরিমাণ স্বয়ংক্রিয় ভাবে দেখাবে অ্যাপ।
এর পর তৈরি হবে একটি QR কোড। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সেই QR কোড স্ক্যান করে অনলাইনে জরিমানার টাকা জমা দিতে পারবেন। টাকা জমা পড়লেই তাঁর মোবাইলে SMS-এর মাধ্যমে রসিদ পৌঁছে যাবে।
প্রাথমিক ভাবে অনলাইনেই জরিমানা নেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট SOP তৈরি করে অফলাইন জরিমানা আদায়ের ব্যবস্থাও চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
জরিমানার টাকা যাবে সংশ্লিষ্ট পুরসভার অ্যাকাউন্টে
জানা গিয়েছে, জরিমানার টাকা কোনও দফতরের অ্যাকাউন্টে যাবে না। যে এলাকায় নিয়মভঙ্গের ঘটনা ঘটবে, সংশ্লিষ্ট পুরসভা বা নগর স্থানীয় সংস্থার (ULB) অ্যাকাউন্টেই সরাসরি জমা পড়বে সেই টাকা।
প্রতিটি পুরসভায় ওয়ার্ডভিত্তিক দল তৈরি করা হচ্ছে। পরিচ্ছন্নতা কর্মী, ‘নির্মল বন্ধু’ ও ‘নির্মল সাথী’-দের এই কাজে যুক্ত করা হবে। তাঁদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, প্রয়োজনে পুলিশ যাতে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সহযোগিতা করে, সে বিষয়েও পুলিশকে সচেতন করা হয়েছে বলে দফতরের তরফে জানানো হয়েছে।
‘জরিমানা আদায় নয়, সচেতন করাই লক্ষ্য’
দফতরের কর্তাদের বক্তব্য, বিপুল পরিমাণ জরিমানা আদায়ের কোনও লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়নি। বরং মানুষকে বোঝানোই এই ব্যবস্থার প্রধান উদ্দেশ্য। রাস্তায় ময়লা ফেলার আগে নাগরিক যেন এক বার ভাবেন—এই বার্তাই পৌঁছে দিতে চাইছে সরকার।
কর্তাদের কথায়, শুধুমাত্র সরকারি উদ্যোগে শহর পরিষ্কার রাখা সম্ভব নয়। নাগরিকদেরও নিজেদের দায়িত্ব বুঝতে হবে। বাড়ির জানলা দিয়ে প্যাকেট বা অন্য কোনও বর্জ্য রাস্তায় না ফেলে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলার অভ্যাস তৈরি করতে হবে।
আবাসিক এলাকায় নয়, বাজার-বাসস্ট্যান্ডে ডাস্টবিন
শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও একাধিক পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। আবাসিক এলাকায় নির্বিচারে ডাস্টবিন বসানো হবে না। পরিবর্তে বাজার, হাট, বাসস্টপ, রেলস্টেশনের সামনের মতো জনবহুল এলাকায় ডাস্টবিন বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বাড়ি থেকে ভেজা ও শুকনো বর্জ্য আলাদা করে সাফাইকর্মীদের হাতে তুলে দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। রান্নাঘরের সবজি ও ফলের বর্জ্যের মতো ভেজা আবর্জনা এক দিকে এবং কাগজ, কাচ, কাঠ, ব্যাটারি-সহ অন্যান্য শুকনো বর্জ্য আলাদা করে দেওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া যেখানে পুরনো ‘ভ্যাট’ রয়েছে, সেগুলি সরিয়ে সেখানে নিয়ম মেনে বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করার কথাও জানানো হয়েছে।
নিষিদ্ধ প্লাস্টিকের বদলে বিকল্পের ব্যবস্থা
১২৫ মাইক্রনের কম পুরু প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করতে শুধু জরিমানা নয়, বিকল্প ব্যবহারের উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। বাজারগুলিতে পরিবেশবান্ধব ব্যাগের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মাছ-মাংস বহনের জন্য প্লাস্টিকের মতো দেখতে কিন্তু জৈবভাবে পচনশীল ব্যাগ এবং ৫ থেকে ১০ টাকার মধ্যে কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে।
যে সমস্ত কারখানা নিষিদ্ধ প্লাস্টিক তৈরি করছে, তাদেরও সেই প্লাস্টিক উৎপাদন বন্ধ করে বিকল্প পরিবেশবান্ধব সামগ্রী তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পাবলিক টয়লেট ও ইউরিনালের সংখ্যা বাড়ানোর নির্দেশ
প্রকাশ্যে প্রস্রাব বা মলত্যাগ রুখতে পর্যাপ্ত সংখ্যক পাবলিক টয়লেট ও ইউরিনাল তৈরির উপরও জোর দেওয়া হয়েছে। বাজার, হাট, বাসস্ট্যান্ড, বাস টার্মিনাস এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন টয়লেট তৈরির কথা জানিয়েছে দফতর।
কর্তাদের বক্তব্য, কোথাও ইউরিনালের প্রয়োজন থাকলে জায়গা চিহ্নিত করে তা তৈরির জন্য অর্থের সমস্যা হবে না। শুধু নির্মাণ করলেই হবে না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণ মানুষ যাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পাবলিক টয়লেট বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারেন, সেই ব্যবস্থার উপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ডিজিটাল তথ্যেই ধরা পড়বে কোথায় পরিষেবার ঘাটতি
নতুন অ্যাপের মাধ্যমে শুধু জরিমানা আদায় নয়, কোথায় কী ধরনের সমস্যা বেশি হচ্ছে, তার তথ্যও পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন আধিকারিকেরা।
কোথায় বেশি প্রকাশ্যে প্রস্রাব হচ্ছে, কোথায় বেশি থুতু ফেলা হচ্ছে কিংবা কোথায় ডাস্টবিনের অভাব রয়েছে—ডিজিটাল তথ্যের মাধ্যমে সেই এলাকাগুলি চিহ্নিত করা যাবে। এরপর সংশ্লিষ্ট পুরসভাকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে।
অর্থাৎ, নাগরিকের নিয়মভঙ্গের তথ্যই ভবিষ্যতে পুর পরিষেবা উন্নত করার পরিকল্পনার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
বাড়ি বাড়ি বর্জ্য সংগ্রহেও QR কোড
বাড়ি বাড়ি বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থাকেও ধীরে ধীরে ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রত্যেক বাড়িতে QR কোড থাকবে। সাফাইকর্মী বাড়িতে গিয়ে সেই QR কোড স্ক্যান করবেন। ফলে কোন বাড়িতে কখন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, তার ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হবে।
কোনও বাড়িতে সাফাইকর্মী না এলে বাসিন্দারা অভিযোগ জানাতে পারবেন। একই ভাবে নির্দিষ্ট নিয়মে বর্জ্য আলাদা করে না দিলে সাফাইকর্মীরাও তা রিপোর্ট করতে পারবেন। বর্জ্যবাহী গাড়িগুলির চলাচলও জিও-ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে নজরদারি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৭-এর মধ্যে ‘লিগ্যাসি ওয়েস্ট’ সরানোর লক্ষ্য
শুধু প্রতিদিনের বর্জ্য নয়, বছরের পর বছর জমে থাকা ‘লিগ্যাসি ওয়েস্ট’ বা পাহাড়প্রমাণ পুরনো আবর্জনাও সরানোর লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় জমে থাকা এই পুরনো বর্জ্য সম্পূর্ণ ভাবে সরিয়ে ফেলার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
পরবর্তী পর্যায়ে এই বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস, বায়োম্যানিওর এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে ডেঙ্গি মোকাবিলার যোগ
পরিচ্ছন্নতা অভিযানের সঙ্গে ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকেও যুক্ত করা হয়েছে। দফতরের দাবি, গত বছরের তুলনায় এ বছর এখনও পর্যন্ত ডেঙ্গির ঘটনা প্রায় ১৫ শতাংশ কম দেখা যাচ্ছে। শহর ও পুর এলাকাগুলি পরিষ্কার রাখা গেলে মশার বংশবিস্তার কমবে এবং ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণেও তার প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন আধিকারিকেরা।
দফতরের বার্তা স্পষ্ট—শুধু জরিমানা করে শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়। প্রশাসনের উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ নিজের দায়িত্ব পালন করলেই আগামী এক বছরের মধ্যে শহর ও রাজ্যের নগর এলাকাগুলিতে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন আনা সম্ভব।
#আমারকলকাতা #পশ্চিমবঙ্গ #পরিচ্ছন্নশহর #ময়লাফেললেজরিমানা #CleanKolkata #WasteManagement #PlasticBan #QRFine #PublicToilet #LegacyWaste #Dengue #WestBengal