
আমার কলকাতা প্রতিবেদন, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে পরপর পুলিশি এনকাউন্টার ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই অপরাধ দমনে পুলিশকে কঠোর পদক্ষেপের বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মহিলাদের উপর অত্যাচার, ধর্ষণ, মাদক কারবার এবং দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশকে পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজ করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত পদক্ষেপ নিতে হবে আইনের মধ্যে থেকেই।
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা এবং মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে পৃথক পুলিশি গুলির ঘটনায় দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়। এর আগে জুলাই মাসে বারুইপুরেও একই ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছিল। পরপর এই ঘটনাগুলির পর রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অপরাধ দমনে পুলিশকে পাশে থাকার আশ্বাস
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, মহিলাদের উপর অত্যাচার এবং মাদক সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ করতে বলা হয়েছে। গাঁজা, চরস, ফেনসিডিল, হেরোইন ও কোকেনের মতো মাদকদ্রব্যের কারবারের বিরুদ্ধে প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযান চালানোর কথাও বলেছেন তিনি।
তাঁর দাবি, পুলিশ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। পরিস্থিতি অনুযায়ী পুলিশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কর্তব্য পালন করতে গিয়ে পুলিশকর্মীরা সমস্যায় পড়লে পুলিশমন্ত্রী হিসেবে তিনি তাঁদের পাশে দাঁড়াবেন বলেও আশ্বাস দিয়েছেন।
তবে এই বার্তার পাশাপাশি আইনের শাসন বজায় রাখা এবং প্রতিটি পদক্ষেপের ক্ষেত্রে আইন মেনে চলার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে উঠে এসেছে তাঁর বক্তব্যে।
উত্তরপ্রদেশের সঙ্গে তুলনা নয়, পুলিশ বাড়ানোই লক্ষ্য
পশ্চিমবঙ্গে পরপর এনকাউন্টারের ঘটনা নিয়ে উত্তরপ্রদেশের আইনশৃঙ্খলা মডেলের সঙ্গে তুলনা করা হলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি রাজ্যের পরিস্থিতি আলাদা। সংশ্লিষ্ট রাজ্যের পরিবেশ ও ঘটনার প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তাই পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতিকে অন্য রাজ্যের সঙ্গে এক করে দেখতে চান না তিনি।
পুলিশবাহিনীর সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কলকাতা ও রাজ্য পুলিশে একাধিক নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। ১১ হাজার রাজ্য পুলিশকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে জানুয়ারির মধ্যে নিয়োগপত্র দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কলকাতা পুলিশের আরও চার হাজার কর্মী নিয়োগ এবং ৩০০ জন সাব-ইনস্পেক্টর নিয়োগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
এ ছাড়া নতুন করে ৯ হাজার রাজ্য পুলিশকর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরিকল্পনার কথা জানান। তাঁর দাবি, আগামী এক বছরের মধ্যে রাজ্যে পুলিশবাহিনীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোই সরকারের লক্ষ্য। তবে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংরক্ষণনীতি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে বলেও জানান তিনি।
১১২ পরিষেবায় আরও গাড়ি ও পুলিশকর্মী
জরুরি পুলিশি পরিষেবা ১১২-কে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, বর্তমানে থাকা ব্যবস্থাকে সম্প্রসারণ করে আরও গাড়ি, মোটরসাইকেল এবং পুলিশকর্মী মোতায়েনের লক্ষ্য রয়েছে।
এই পরিষেবার মাধ্যমে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছনো এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য বলে তিনি জানান।
প্রতিবাদের অধিকার রয়েছে, তবে মানতে হবে আইন
রাজ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বিক্ষোভের প্রসঙ্গেও মুখ্যমন্ত্রী নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তাঁর বক্তব্য, গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দল, সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের নিজেদের মতামত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বা মোমবাতি মিছিলেও আপত্তি নেই। তবে কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি নিতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করা যাবে না।
তিনি জানান, কোনও কর্মসূচির ক্ষেত্রে পুলিশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। আইন ভাঙা বা অনুমতি ছাড়া এমন কোনও জমায়েত করা, যার ফলে জনজীবন ব্যাহত হয়, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, রাজনৈতিক বিরোধিতা গণতন্ত্রের অংশ। কিন্তু প্রতিবাদের নামে আইন হাতে তুলে নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
ভুয়ো খবর ছড়ালে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি
সামাজিক মাধ্যমে ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর খবর ছড়ানোর বিষয়েও কড়া বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সংগঠন বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে ভুল তথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
বিশেষ করে কোনও দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে প্রকৃত তথ্যের বাইরে গিয়ে সংখ্যা বাড়িয়ে প্রচার করা হলে তার প্রমাণ দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, কোনও ঘটনার সমালোচনা করা বা ইতিবাচক-নেতিবাচক মতামত প্রকাশ করা নাগরিকদের অধিকার। কিন্তু মিথ্যা তথ্য প্রচার করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা হলে পুলিশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে।
এই ধরনের ঘটনা মোকাবিলায় পুলিশের বিশেষ নজরদারি ও ব্যবস্থা আরও জোরদার করার কথাও জানান তিনি।
দুর্গাপুজো ও বিসর্জনের নিরাপত্তা নিয়ে পর্যালোচনা
দুর্গাপুজো ও বিসর্জন ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রসঙ্গও উঠে আসে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে। তাঁর দাবি, রাজ্যে বিপুল সংখ্যক পুজো ও বিসর্জন প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে হয়। সেই কারণে দুর্ঘটনা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, বাজি এবং অন্যান্য সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে হয়।
বিসর্জনের শোভাযাত্রা এবং ধর্মীয় কর্মসূচির অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করার কথা বলেন তিনি। কোথাও কোনও নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধ থাকলে তার কারণ খতিয়ে দেখা এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা সংশোধনের ইঙ্গিত দেন মুখ্যমন্ত্রী।
ঘূর্ণিঝড় নিয়ে সতর্ক প্রশাসন, প্রস্তুত কন্ট্রোল রুম
রাজ্যের আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়েও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আবহাওয়া সংক্রান্ত হলুদ সতর্কবার্তার খবর প্রশাসন পেয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তর, পুলিশ, উপকূলবর্তী এলাকার কর্তৃপক্ষ ও মৎস্যজীবীদের প্রয়োজনীয় সতর্কতা জানানো হয়েছে।
তিনি জানান, ভবানী ভবন, নবান্ন এবং সেচ দপ্তরে কন্ট্রোল রুম রয়েছে। পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সাধারণ মানুষ ও উপকূলবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক করা হবে।
প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশায় প্রয়োজন হলে পশ্চিমবঙ্গের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ওড়িশা সাহায্য চাইলে প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করা হবে। একই সঙ্গে বিপর্যয় মোকাবিলায় ওড়িশার প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতার প্রশংসা করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সরকারের বার্তা
সব মিলিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে অপরাধ দমন, পুলিশবাহিনী সম্প্রসারণ, জরুরি পরিষেবা শক্তিশালী করা এবং ভুয়ো খবরের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের বিষয়গুলি গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও গণতান্ত্রিক অধিকার বজায় রাখার কথাও বলেছেন তিনি।
রাজ্যে অপরাধ দমনে সরকারের এই অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং পুলিশি পদক্ষেপের ক্ষেত্রে আইনের শাসন কতটা বজায় থাকে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
