
রাজেন্দ্র নাথ দত্ত, মুর্শিদাবাদ: রেজিনগর উপনির্বাচনের ফলাফলে বড় চমক। এই প্রথম রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ের মুখ দেখল বিজেপি। বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার ১ লক্ষ ২৯ হাজার ৯১৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী গোলাম নবী আজাদ রবিন পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৯৮টি ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে জয়ের ব্যবধান ৭৫ হাজার ৮১৬ ভোট।
উপনির্বাচনের ফল প্রকাশের পর আরও একটি বিষয় নজর কেড়েছে। এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ১৫ জন প্রার্থীর মধ্যে রবিন ছাড়া বাকি ১৩ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা।
এক-ষষ্ঠাংশ ভোট না পেলেই বাজেয়াপ্ত হতে পারে জামানত
নির্বাচনী নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্তে কোনও প্রার্থী মোট বৈধ ভোটের এক-ষষ্ঠাংশের বেশি ভোট না পেলে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হতে পারে। রেজিনগর উপনির্বাচনে অধিকাংশ প্রার্থী সেই প্রয়োজনীয় ভোটের সীমা অতিক্রম করতে পারেননি বলে প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে।
তবে জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়া প্রার্থীদের সঠিক সংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী হিসাব নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
তৃতীয় স্থানে কংগ্রেস, অন্যান্য প্রার্থীদের ভোট কত?
রেজিনগর উপনির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী আব্দুল্লাহিল কাফি ৬ হাজার ১৬৮ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন। চতুর্থ স্থানে থাকা মমতা তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী পেয়েছেন ৩ হাজার ৮৪৭ ভোট। পঞ্চম স্থানে সিপিআইএম প্রার্থী মহম্মদ সাঈদ পেয়েছেন ৩ হাজার ৭৯৭ ভোট। ষষ্ঠ স্থানে থাকা ঋতব্রত তৃণমূলের প্রার্থী সফিউজ্জামান শেখ পেয়েছেন ২ হাজার ৪৪ ভোট।
অন্যদিকে, নির্দল প্রার্থী তুষার পান্ডে পেয়েছেন মাত্র ২১১ ভোট। নির্বাচনে বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের ভোটের এই ব্যবধান রেজিনগরের রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
সংখ্যালঘু ভোট নিয়ে বিজেপির দাবি
রেজিনগরে জয়ের পর বিজেপির তরফে দাবি করা হয়েছে, এই কেন্দ্রের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বহু মানুষ উন্নয়নের স্বার্থে বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকারকে সমর্থন করেছেন। দলের দাবি, সেই সমর্থনই তাদের এই বড় জয়ের অন্যতম কারণ।
তবে ভোটারদের সিদ্ধান্তের পিছনে ঠিক কী কী কারণ কাজ করেছে, তা বুঝতে বুথভিত্তিক ফলাফল এবং অন্যান্য নির্বাচনী তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রেজিনগর কেন্দ্র থেকে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী হুমায়ুন কবীর ১ লক্ষ ২৩ হাজার ৫৩৬ ভোট পেয়েছিলেন। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৫১.৬২ শতাংশ। সেই নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন এবং দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল ৫৮ হাজার ৮৭৬।
অন্যদিকে, উপনির্বাচনে বিজেপির শাখারভ সরকার ১ লক্ষ ২৯ হাজার ৯১৪ ভোট পেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের হার ৬৩.১৪ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, উপনির্বাচনে বিজেপির ভোটের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির ভোটের হার কমেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে দুই নির্বাচনের ভোটের শতাংশের তুলনা প্রকাশের আগে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান যাচাই করা জরুরি।
জয়ের কৃতিত্ব দলকে দিলেন শাখারভ সরকার
জয়ের পর শাখারভ সরকার বলেন, “এটা আমি করিনি, রেজিনগরের মানুষ করেছেন। আমার দাম মাত্র দু’পয়সা। বিজেপি দল ছাড়া আমার কোনও দাম নেই।”
দলের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি আরও বলেন, “ছাত্র যতই পড়ুক, পরীক্ষায় ভালো ফল করতে একজন মাস্টারমশাই লাগে। আমাদের দলের কোচ ভালো ছিলেন, কর্মকর্তারা ভালো মাঠ তৈরি করতে পেরেছেন, তাই খেলোয়াড় হিসেবে আমি ভালো ফল করেছি।”
তাঁর বক্তব্যে নির্বাচনী সাফল্যের জন্য দলের নেতৃত্ব ও কর্মীদের অবদানের বিষয়টি উঠে এসেছে।
ভোট নিয়ে অভিযোগ কংগ্রেস ও তৃণমূল প্রার্থীর
অন্যদিকে, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রানীনগরের কংগ্রেস বিধায়ক জুলফিকার আলী। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ ও আরএসএসের লোকেরা পরিকল্পিতভাবে ভোট পরিচালনা করেছে এবং কোন দল কত ভোট পাবে, তা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। কংগ্রেস প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঘটনাকেও তিনি সেই পরিকল্পনার অংশ বলে দাবি করেছেন।
তবে এই অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। তাই বিষয়টি অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
মমতা তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরীও নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর দাবি, রেজিনগর উপনির্বাচনে মানুষকে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে দেওয়া হয়নি। সেই কারণেই তাঁর জামানতের টাকা বাজেয়াপ্ত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
রেজিনগরের ফলাফল ঘিরে রাজনৈতিক চর্চা
রেজিনগর উপনির্বাচনে বিজেপির বড় জয় এবং অধিকাংশ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কম ভোট পাওয়া রাজ্যের রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিজেপি এই ফলাফলকে উন্নয়নের পক্ষে মানুষের সমর্থন হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের একাংশ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
নির্বাচনের ফলাফল, ভোটের ব্যবধান এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বক্তব্য—সব মিলিয়ে রেজিনগর এখন রাজ্যের রাজনীতিতে আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।