
স্বপন কুমার মণ্ডল, কলকাতা: জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্র ও বিজেপির বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তুললেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, গত কয়েক মাসে বাংলার গণতন্ত্র, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সম্প্রীতির উপর ‘আঘাত’ নেমে এসেছে। SIR থেকে শুরু করে ভোটপ্রক্রিয়া, পুলিশি ভূমিকা, দলীয় কার্যালয় দখল এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা—একাধিক ইস্যুতে সরব হন তিনি।
বক্তব্যের শুরুতেই রাজ্যবাসীকে জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানান মমতা। শান্তিপূর্ণ ভাবে উৎসব পালনের পাশাপাশি জন্মাষ্টমীর পবিত্রতা রক্ষার আবেদনও করেন তিনি। এর পরেই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্যে বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক সুর নেন তৃণমূল নেত্রী।
মমতার অভিযোগ, SIR-এর নামে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া, নতুন করে নাম না তোলা, মানুষকে বঞ্চিত করা এবং ভয় দেখানোর মতো ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি EVM এবং গণনায় কারচুপির অভিযোগও তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে বাংলার নির্বাচনকে প্রভাবিত করা হয়েছে।
তবে মমতার তোলা এই অভিযোগগুলির স্বতন্ত্র সত্যতা তাঁর বক্তব্য থেকে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
‘বাংলার অস্তিত্ব ও সংস্কৃতি বিপন্ন’
মমতার কথায়, ‘‘বাংলার অস্তিত্ব বিপন্ন হতে চলেছে। বাংলার সংস্কৃতি বিপন্ন হতে চলেছে।’’ শিক্ষা, সম্প্রীতি, সংস্কৃতি ও সভ্যতার উপরেও আঘাত আসছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রাজ্যের বিভিন্ন জেলার রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে তাঁর দাবি, বারুইপুর থেকে কোচবিহার, বাঁকুড়া, গড়বেতা, হাওড়া, হুগলি, বর্ধমান, বীরভূম থেকে উত্তরবঙ্গ—বিভিন্ন জায়গায় মানুষ সমস্যার মুখে পড়ছেন। বহু মানুষ বাড়িছাড়া বলেও দাবি করেন তিনি।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও সরব হন মমতা। তাঁর অভিযোগ, সরকার বা শাসকপক্ষের সমর্থনে থাকলে সংবাদমাধ্যমকে ভাল চোখে দেখা হলেও সমালোচনা করলেই তাদের উপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত একটি ঘটনায় আনন্দবাজার পত্রিকার দফতরে রং করার প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। সংবাদমাধ্যম কোন খবর প্রকাশ করবে, কোন শব্দ ব্যবহার করবে—তা তাদের সম্পাদকীয় স্বাধীনতার বিষয় বলে মন্তব্য করেন মমতা।
দলীয় কার্যালয় দখলের অভিযোগ
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁদের প্রায় চার হাজার দলীয় কার্যালয় দখল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর দাবি, দলীয় কার্যালয় থেকে নথিপত্র, আসবাবপত্র পর্যন্ত লুট করা হয়েছে। এমনকি রাজনৈতিক দলের পতাকারও অবমাননা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কলকাতার শেক্সপিয়র থানার কাছে একটি দলীয় কার্যালয়ে রাতের অন্ধকারে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগও তোলেন মমতা। তাঁর দাবি, অফিসে থাকা কর্মীদের আটকে রাখা হয়েছিল এবং নথিপত্র ও কম্পিউটার-সহ বিভিন্ন সামগ্রী তছনছ করা হয়েছে।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, পুলিশকে রক্ষকের ভূমিকা পালন করতে হবে, ভক্ষকের নয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পুলিশকে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একই সঙ্গে মমতা বলেন, ‘‘সব পুলিশ পরিবার খারাপ—আমি তা বিশ্বাস করি না।’’ যারা ইউনিফর্মের মর্যাদা রেখে মানুষের নিরাপত্তায় কাজ করেন, তাঁদের প্রতি তাঁর সম্মান রয়েছে বলেও জানান তিনি।
নারী, শিশু ও ছাত্রদের নিরাপত্তা
রাজ্যের বিভিন্ন ঘটনায় নারী, শিশু, প্রবীণ ও ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মমতা। কোচবিহারের দিনহাটা-সিতাই এলাকার একটি শিশুকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের প্রসঙ্গও তাঁর বক্তব্যে আসে।
বাঁকুড়ার কয়েক জনের গড়বেতায় আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমস্যার অভিযোগও করেন তিনি। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বহু মানুষ এখনও ঘরছাড়া।
‘Z Plus’ নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
নিজের নিরাপত্তা নিয়েও কেন্দ্রকে নিশানা করেন মমতা। তাঁকে ‘Z Plus’ নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা অস্বীকার করে তাঁর বক্তব্য, তাঁর বাড়ি থেকে নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
মমতার দাবি, তিনি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা চান না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর তাঁর আস্থা রয়েছে। ‘‘Of the people, by the people, for the people’’—এই গণতান্ত্রিক আদর্শের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষের জন্যই তাঁরা কাজ করবেন।
SIR-এর মাধ্যমে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তৃণমূল নেত্রী। রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে যথাযথ আলোচনা না করেই বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি তাঁর।
SIR নিয়ে ফের সরব
তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন মমতা। তাঁর দাবি, বাংলায় রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা প্রকাশ করে মমতা বলেন, বাংলার ক্ষেত্রেও মানুষের অভিযোগ ও রাজনৈতিক মামলাগুলি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গেও আক্রমণ
যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি এবং বারাসত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ তুলে ছাত্রসমাজের উপর চাপ তৈরির অভিযোগও করেন মমতা। তাঁর বক্তব্য, বাংলার ছাত্র-যুব, মহিলা এবং সাধারণ মানুষের আন্দোলন এখনও সম্পূর্ণভাবে সামনে আসেনি।
শেষে বিজেপির উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়ে মমতা বলেন, কোনও রাজনৈতিক দল চিরকাল ক্ষমতায় থাকে না। সময় বদলায়, পরিস্থিতিও বদলায়। বাংলার মানুষ গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই চালিয়ে যাবে বলেও দাবি করেন তিনি।
জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা দিয়ে শুরু হওয়া দীর্ঘ বক্তব্যে এ দিন মূলত বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভোটার তালিকা সংশোধন, রাজনৈতিক হিংসা, পুলিশি ভূমিকা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা—এই একাধিক বিষয়কে সামনে রেখে কেন্দ্র ও বিজেপির বিরুদ্ধে সরব হন মমতা।
#মমতাবন্দ্যোপাধ্যায় #জন্মাষ্টমী #জন্মাষ্টমীরবার্তা #বাংলাররাজনীতি #পশ্চিমবঙ্গ #বিজেপি #SIR #বাংলারগণতন্ত্র #বাংলারসংস্কৃতি #তৃণমূলকংগ্রেস #কলকাতারখবর #আমারকলকাতা