
হিটলার ও নাৎসিবাদ ইতিহাস নয়, বর্তমান সমাজের অন্ধকারকে দেখার এক শক্তিশালী প্রতীক
নিজস্ব সংবাদদাতা, আমার কলকাতা:
একটি কারাগার, কয়েকজন বন্দি এবং একটি রাত। সেই অন্ধকারের মধ্যেই ধীরে ধীরে সামনে আসে ক্ষমতা, ভয়, নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের অস্তিত্বের এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা। Kasba Hijibiji-র নাটক ‘কারাকাহিনী’ সেই অর্থে শুধুমাত্র একটি মঞ্চনাটক নয়; বরং বর্তমান সমাজকে নতুন করে দেখার একটি তীক্ষ্ণ মাধ্যম।
নাটকের কেন্দ্রে রয়েছে একটি কারাগার এবং তার ভেতরে চলতে থাকা এক নির্মম পরীক্ষা। গল্পে জার্মান নাৎসি শাসন বা হিটলারের সময়কে সরাসরি পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। বরং হিটলার ও নাৎসিবাদ এখানে একটি শক্তিশালী মেটাফর। অতীতের সেই ভয়াবহতাকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে নাটকটি বর্তমান সমাজের নানা অন্ধকার দিককে দর্শকের সামনে তুলে ধরে।
ক্ষমতার অপব্যবহার, মানুষের উপর নিয়ন্ত্রণ, ভয়, অসহায়ত্ব এবং সামাজিক অসংগতির নানা চিত্র পরতে পরতে উন্মোচিত হয়। ফলে কারাগারটি শুধুমাত্র একটি বাস্তব স্থান হিসেবে থাকে না; ধীরে ধীরে তা হয়ে ওঠে বৃহত্তর সমাজেরই প্রতিচ্ছবি।

অভিনয়ে নজর কাড়লেন কলাকুশলীরা
নাটকের মুখ্য চরিত্র জেলার অজিতেশ বেরা-র ভূমিকায় কমল চট্টোপাধ্যায়। কর্তৃত্ব, নির্মমতা এবং চরিত্রটির মানসিক জটিলতা তিনি দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি নাটকের টানটান আবহকে আরও ঘনীভূত করেছে।
ডাক্তার অনিমেষের চরিত্রে দিব্যদূত রায়চৌধুরী-র অভিনয়ও উল্লেখযোগ্য। চরিত্রটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং পরিস্থিতির সঙ্গে তার মানসিক টানাপোড়েন সংযত অথচ শক্তিশালী অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।
এছাড়াও শ্রীতন্যা চক্রবর্তী, মনীষা নস্কর এবং স্নেহা সরকার তাঁদের নিজ নিজ চরিত্রে সাবলীল অভিনয় করেছেন। বন্দিত্বের আতঙ্ক, অসহায়তা এবং প্রতিরোধের অনুভূতি তাঁদের অভিনয়ে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে।
দুই প্রহরীর চরিত্রে বিক্রম সরকার ও অভিজ্ঞান মাইতি-র অভিনয়ও নাটকের আবহ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। তাঁদের উপস্থিতি মঞ্চের চাপা উত্তেজনাকে আরও তীব্র করেছে।
আলো-শব্দে তৈরি হয়েছে অন্ধকারের ভাষা
‘কারাকাহিনী’-র অন্যতম শক্তিশালী দিক তার আলো ও শব্দের ব্যবহার। আলো এখানে শুধুমাত্র মঞ্চ আলোকিত করার উপকরণ নয়; বরং চরিত্রগুলির মানসিক অবস্থার পাশাপাশি নাটকের আবহ নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শব্দপ্রক্ষেপণও সেই আবহকে আরও গভীর করেছে। অন্ধকার, আলো, শব্দ এবং অভিনেতাদের চলন—সব মিলিয়ে মঞ্চে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ক্রমাগত চাপ, যা দর্শককে নাটকের ভেতরে টেনে নিয়ে যায়।
কোরিওগ্রাফিতে সামাজিক বক্তব্য
নাটকের কোরিওগ্রাফিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শরীরের গতিবিধি, দলগত মুভমেন্ট এবং মঞ্চের বিভিন্ন অংশের ব্যবহার নাটকের বক্তব্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
এখানে কোরিওগ্রাফি শুধুমাত্র সৌন্দর্যবর্ধনের উপাদান নয়; বরং নাটকের বক্তব্য প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা হিসেবে কাজ করেছে।

ইতিহাসের আড়ালে বর্তমানের প্রশ্ন
‘কারাকাহিনী’-র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—নাটকটি দর্শককে সরাসরি বক্তৃতা দিয়ে কিছু বোঝাতে চায় না। বরং একের পর এক পরিস্থিতি, চরিত্র ও দৃশ্যের মধ্য দিয়ে সমাজের বিভিন্ন অসংগতি দর্শকের সামনে তুলে ধরে।
হিটলার বা নাৎসিবাদ এখানে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয়; বরং একটি প্রতীক। সেই প্রতীকের আড়াল থেকেই বর্তমান সময়ের ক্ষমতা, ভয়, নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক বাস্তবতাকে নতুন করে দেখা যায়।
কারাগারের দরজা বন্ধ হওয়ার পর বন্দিরা শুধু কারাগারের মধ্যেই আটকে থাকে না। সেই বন্দিত্বের ছায়া ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে দর্শকের মনেও।
নাটক শেষ হওয়ার পর তাই থেকে যায় একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই কারাগারের বাইরে আছি, নাকি আমাদের চারপাশের সমাজই এক অদৃশ্য কারাগার?
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই Kasba Hijibiji-র ‘কারাকাহিনী’ তার নিজস্ব অভিঘাত তৈরি করে। অন্ধকারের ভেতর দিয়ে বর্তমান সমাজকে দেখার এই প্রচেষ্টা দর্শককে শুধু নাটক দেখায় না, বরং নিজের চারপাশের বাস্তবতাকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।