
সৌরভ দত্ত, আমার কলকাতা: সোমনাথ মন্দিরের ১০০০ বছরের ঐতিহ্য স্মরণে দেশজুড়ে পালন করা হচ্ছে ‘সোমনাথ স্বাভিমান পর্ব’। এই কর্মসূচির আওতায় রাজ্যের ১০০০ ভক্তদের বিনামূল্যে সোমনাথ দর্শনের ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই কথা মতোই সোমনাথের উদ্দেশে শনিবার বেলা ১২টায় কলকাতা স্টেশন থেকে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে বিশেষ ট্রেন।
দীর্ঘদিনের ইচ্ছা থাকলেও দূরত্ব ও খরচের কারণে অনেকেরই সামর্থের বাইরে থেকে যায় সোমনাথ দর্শন। রাজ্য সরকারের হাত ধরে এবার সেই সুযোগ চলে এল হাতের নাগালে। পুজোর আগে সম্পূর্ণ নিখরচায় সোমনাথ মন্দির সোমনাথ মন্দির দর্শণের সুযোগ পুণ্যার্থীদের জন্য নিঃসন্দেহে এক বিশেষ প্রাপ্তি! রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ১০০০ জন ভক্তকে বেছে নিয়ে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গুজরাটের বিখ্যাত সোমনাথ মন্দিরে। রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে পুণ্যার্থীদের বিনামূল্যে গুজরাটের ঐতিহাসিক সোমনাথ মন্দির দর্শন করাবে সরকার। রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী শংকর ঘোষের হাত ধরে এই যাত্রার শুভ সূচনা হয়। কলকাতা স্টেশন থেকে ‘সোমনাথ যাত্রা’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পর্যটন ও তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী পুর্ণিমা চক্রবর্তী, পর্যটন ও তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের মন্ত্রী উমেশ রাই, নগরোন্নয়ন ও পুর বিষয়ক এবং পরিষদীয় বিষয়ক দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী।
বিশেষ ট্রেনটি ১৪ সেপ্টেম্বর সোমনাথে পৌঁছবে। সোমনাথ তীর্থ দর্শনের পর ১৭ সেপ্টেম্বর সেখান থেকে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেবে ট্রেনটি। কলকাতা স্টেশনে এসে পৌঁছবে ২০ সেপ্টেম্বর ভোরে। এই যাত্রাপথে সম্পূর্ণ খরচ বহন করবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ। তবে সোমনাথে পৌঁছনোর পর তীর্থযাত্রীদের থাকা, খাওয়া এবং স্থানীয় দর্শন ও যাতায়াতের ব্যবস্থা গুজরাট সরকারের দায়িত্বাধীন হবে। জানা গিয়েছে, কলকাতা স্টেশনে পৌঁছনোর জন্য জেলা থেকে আসা যাত্রীদের জন্য জেলা প্রশাসনের তরফে বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারি তরফে প্রতিনিধিও মোতায়েন করা হয়েছে জেলায় জেলায়। পশ্চিমের জেলা যেমন – পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পূর্ব বর্ধমান ও পশ্চিম বর্ধমানের তীর্থযাত্রীরা আসানসোল থেকে বিশেষ এই ট্রেনে উঠবেন, তার জন্যও আসানসোল স্টেশনে যাত্রী সুবিধার্থে প্রশাসনিক তৎপরতা লক্ষ্য করা গিয়েছে। ট্রেন সফরে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে যাত্রীদের জন্য। কলকাতা থেকে তীর্থযাত্রীরা মন্দিরে গিয়ে এই কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।
প্রকৃত ছেলের ভূমিকাই পালন করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, বয়স্ক বাবা মা-দের এভাবে তীর্থ ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়ে সকলের আশীর্বাদ লাভ করলেন। বাতানুকূল ট্রেনের নিজের সিটে বসেই কথাগুলো বললেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দা অর্চনা চক্রবর্তী।
বয়স বাড়ার সঙ্গে তীর্থযাত্রার ইচ্ছা থাকলেও কাজ, সংসার এবং আর্থিক কারণে অনেকেরই সেই ইচ্ছা পূরণ হয়ে ওঠে না। সেই জায়গায় রাজ্য সরকারের উদ্যোগে বিনামূল্যে সোমনাথ দর্শনের সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত রাজ্যের বিভিন্ন জেলার প্রবীণ-প্রবীণা-সহ তীর্থযাত্রীরা৷
কলকাতা স্টেশন থেকে বাতানুকূল ট্রেনে সোমনাথের উদ্দেশ্যে রওনা দেন প্রায় ১০০০ জন তীর্থযাত্রী। সেই যাত্রীদের মধ্যেই ছিলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দা অর্চনা চক্রবর্তী। তার কথায়, ‘‘বয়সকালে তীর্থযাত্রা হিন্দুশাস্ত্র মতে অত্যন্ত পুণ্যের। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও সংসার ও কাজের ব্যস্ততায় এতদিন তা হয়ে ওঠেনি। এই বয়সে সরকারি উদ্যোগে এমনভাবে তীর্থ ভ্রমণের সুযোগ করে দেওয়ায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে প্রকৃত ছেলের মতো মনে হচ্ছে।’’ তাঁর কথায়, মুখ্যমন্ত্রীর দীর্ঘায়ু কামনা করছেন তিনি৷

একইভাবে হাওড়ার ইছাপুরের বাসিন্দা বাব্বান পাণ্ডে জানান, এই সুযোগ যে সত্যিই পাবেন, তা তিনি ভাবতেই পারেননি। রাজ্য সরকারের বিনামূল্যে সোমনাথ ভ্রমণের বিষয়টি জানতে পেরে স্ত্রী-সহ আবেদন করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত সুযোগ মিলবে কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল। তাঁর কথায়, ‘‘ঠাকুরের কৃপা হলে হয়তো সুযোগ পাব -এমনটাই ভেবেছিলাম। শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ বাস্তব হয়েছে।’’
হাওড়ার আরেক বাসিন্দা গোপাল আদক শ্বশুর-শাশুড়ি-সহ গোটা পরিবারকে নিয়ে এই তীর্থযাত্রায় সামিল হয়েছেন। তাঁর দাবি, আগে উত্তরাখণ্ড যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সরকারি উদ্যোগে সোমনাথ দর্শনের এমন সুযোগ পাওয়ায় সেই পরিকল্পনা বদলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এই সফরে বেরিয়েছেন তিনি। হাওড়ার কদমতলার বাসিন্দা সন্ধ্যা রানী ঘোষ বলেন, ‘‘খাবারের ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ট্রেন ও পরিষেবা সবকিছুই খুব ভাল। যত্ন সহকারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে’’৷
শ্যামপুকুরের বাসিন্দা মমতা মিশ্রের কথায়, বাংলায় এই ধরনের উদ্যোগের ফলে সাধারণ মানুষও তীর্থযাত্রার সুযোগ পাচ্ছেন। তাঁর মতে, মানুষের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক চাহিদার কথাও সরকার ভাবছে। নদিয়ার রানাঘাটের বাসিন্দা রঞ্জিত দেব বিশ্বাস বলেন, ‘‘জীবনে কোনওদিন ভাবিনি এমন সুযোগ পাব। বিষয়টি আমার কাছে বিস্ময়কর। ভগবানই যেন এই সুযোগ করে দিয়েছেন। পরিষেবাও দারুণ।’’
সুদূর কোচবিহার থেকেও বহু তীর্থযাত্রী এই যাত্রায় যোগ দিয়েছেন। কোচবিহারের বাসিন্দা ডোরা ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘এত সুন্দরভাবে এমন একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন হবে, কোনওদিন ভাবিনি। ভবিষ্যতেও যাতে প্রতি বছর এই ধরনের তীর্থযাত্রার আয়োজন করা হয়, সেই আশা রাখব। মুখ্যমন্ত্রী বিশেষ করে মহিলাদের কথা তিনি ভাবছেন।’’ জানা গিয়েছে, কোচবিহার জেলা থেকে মোট ৩২ জন তীর্থযাত্রী এই যাত্রায় অংশ নিয়েছেন। কোচবিহারের আর এক বাসিন্দা ইতিকা দত্ত জানান, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জন্য তিনি কোচবিহারের মদনমোহন মন্দিরেও পুজো দিয়েছেন৷
সব মিলিয়ে, সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে সোমনাথ দর্শনের সুযোগ পেয়ে যাত্রীদের একাংশ যেমন আপ্লুত, তেমনই তাঁদের বক্তব্যে উঠে এসেছে দীর্ঘদিনের অপূর্ণ তীর্থযাত্রার ইচ্ছা পূরণের আনন্দ।
#সোমনাথদর্শন #সোমনাথযাত্রা #সোমনাথমন্দির #তীর্থযাত্রা #তীর্থযাত্রী #কলকাতা #পশ্চিমবঙ্গ #গুজরাট #আমারকলকাতা #SomnathYatra #SomnathTemple
