
গ্যালোটিনের অন্ধকার ভেঙে দীর্ঘ তিন ঘণ্টার বাজেট বিতর্ক। সিভিক ভলান্টিয়ার রাজনীতি, থমকে থাকা নিয়োগ, বিএএনএস (BNS) চালু এবং আরজি কর কাণ্ডে কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ—এক ঘণ্টার ভাষণে পূর্বসূরিদের তোপ দাগার পাশাপাশি কড়া রোডম্যাপ পেশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী।
স্বপন কুমার মণ্ডল , কলকাতা
দীর্ঘ ১৩ বছর পর বিধানসভায় ঘটল সেই বহুপ্রতীক্ষিত মুহূর্ত। গ্যালোটিনের অন্ধকার ঘরে বন্দি থাকা স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক বিভাগের (দাবি নম্বর ৬৮) বাজেট নিয়ে চলল একটানা তিন ঘণ্টা ব্যাপী উত্তপ্ত ও ঐতিহাসিক আলোচনা। আর আলোচনার সমাপনী পর্বে মুখ খুললেন মুখ্যমন্ত্রী নিজেই। প্রায় এক ঘণ্টার সেই বিস্ফোরক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ জবাবে একদিকে যেমন পূর্বসূরিদের তোপ দাগলেন, অন্যদিকে তেমনই তুলে ধরলেন রাজ্য পুলিশের কঙ্কালসার চেহারা, সিভিক ভলান্টিয়ার বিতর্ক এবং নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে নতুন সরকারের কড়া অবস্থানের কথা।
মা ভারতীকে প্রণাম জানিয়ে বক্তব্য শুরু করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আজকে যারা রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন, এমনকি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা—তারা সবাই জানেন বিগত ১৩ বছর ধরে এই হোম ডিপার্টমেন্টের বাজেট নিয়ে কোনো আলোচনাই হতে দেওয়া হয়নি। বিধানসভায় প্রশ্ন-উত্তরের সুযোগ ছিল না, বাজেট পাঠানো হতো গ্যালোটিনে। কারণ একটাই, সত্যির মুখোমুখি হতে ভয় পেত তৎকালীন সরকার।”
‘সুতো বাঁধা সিভিক ভলান্টিয়ার, খালি পড়ে ৪৩ হাজার শূন্যপদ!’
রাজ্য পুলিশের বর্তমান পরিকাঠামো নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী পরিসংখ্যান তুলে ধরে ক্ষোভ উগরে দেন। তিনি জানান, পুলিশের মূল কাজ অপরাধ রেকর্ড করা, সঠিক তদন্ত করা এবং আদালত থেকে সাজা বা কনভিকশন সুনিশ্চিত করা। কিন্তু বিগত সরকার পুলিশ বিভাগটাকে “যতটা নিচে নামানো যায়, নামিয়ে দিয়ে গেছে।”
মুখ্যমন্ত্রীর পেশ করা তথ্যে উঠে আসে:
শূন্যপদের বিপুল পাহাড়: অর্থ দপ্তরের অনুমোদিত পদ রয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৩৪৪টি (ডিএসপি থেকে জুনিয়র কনস্টেবল)। যার মধ্যে খালি পড়ে রয়েছে ৪৩ হাজার ৭৩টি শূন্যপদ!
সিভিক ভলান্টিয়ার রাজনীতি: স্থায়ী নিয়োগ না হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “স্থায়ী নিয়োগ হলে পুলিশ কথা শুনবে না, ক্যাডার বানানো যাবে না। তাই কোনো যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ বা পরীক্ষার তোয়াক্কা না করে শুধুমাত্র রাজনৈতিক আনুগত্য আর তোলা তোলার স্বার্থে সিভিক ভলান্টিয়ার নিয়োগ করা হয়েছিল। সুতোটা বেঁধে লাটাই নিজেদের হাতে রাখা হয়েছিল—যাতে কথা না শুনলে রেন্যুয়াল আটকে দেওয়া যায়।”
থানার পরিকাঠামো শূন্য: পর্যটন নগরী দীঘা থানার উদাহরণ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আইসি, ডিএসপি আছেন, আর মাত্র ১৫ জন কনস্টেবল! থানা চলছে ৪০০ জন সিভিক দিয়ে। যে কজন কনস্টেবল আছেন, তাদের নেই থাকার ব্যারেক, নেই খাওয়ার কিচেন। ডিএ নেই, পে কমিশন নেই, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর নেই।”
১৫ বছরের পুরোনো ভাঙাচোরা গাড়ি: রাজ্যের থানাগুলিতে ব্যবহৃত বহু গাড়ি ১৫ বছরের বেশি পুরোনো, যার কোনো ইনস্যুরেন্স বা রোড ট্যাক্স নেই। ডিজিপি-র রিপোর্ট উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, এগুলি রাতারাতি বদলানো অসম্ভব, কারণ প্রায় সব গাড়িই মেয়াদউত্তীর্ণ!
রাষ্ট্রপতিকেও মানেনি, বিএনএস চালুই করেনি রাজ্য’
কেন্দ্রীয় আইন ও দেশের সংবিধান অবমাননার অভিযোগ এনে মুখ্যমন্ত্রী প্রাক্তন সরকারকে বিঁধে বলেন, “ব্রিটিশ আমলের পুরনো সিআরপিসি (CRPC) ও আইপিসি (IPC) বদলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মার্গদর্শনে ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহজির দীর্ঘ চেষ্টার পর ২০২৪-এ দেশজুড়ে ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’ (BNS) চালু হয়েছিল। কিন্তু দেশের সংবিধান ও রাষ্ট্রপতি মহোদয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গে এই আইন চালুই করা হয়নি!”
তিনি জানান, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেই প্রথম বিএনএস কার্যকর করেছে এবং কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ উদ্যোগে বিএসএফ, এনআইএ, সিআইডি, সাইবার ও ল সেক্রেটারিদের নিয়ে বড়সড় রিভিউ মিটিং করে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছে।
‘নারী নিরাপত্তায় জিরো টলারেন্স, ঢাল হবেন মুখ্যমন্ত্রী’
নারী নির্যাতন ও কামদুনি থেকে আরজি কর প্রসঙ্গ টেনে প্রাক্তন সরকারের মন্তব্যগুলির তীব্র নিন্দা করেন তিনি। ফুল রেপ-হাফ রেপ কিংবা লাভ অ্যাফেয়ার্সের মতো বিতর্কিত অতীত মন্তব্যগুলির স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন:
“আমরা কেউ ‘ভারত পিতা’ বলি না, ‘ভারত মাতা’ বলি। কোনো মহিলা বা কন্যার ওপর বিন্দুমাত্র নির্যাতন হলে কারোর অনুমতির জন্য অপেক্ষা করবেন না। আইন অনুযায়ী যা করার করে দেবেন, আপনাদের ঢাল হিসেবে আড়াল করবেন এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, মাটিগাড়া বা কুলতলির মতো ঘটনায় সাজা হলেও কেন তা কার্যকর করা যাচ্ছিল না, তার মনিটরিং করবে সরকার। দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ডের উদাহরণ টেনে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, সুপ্রিম কোর্ট ও রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল প্রক্রিয়ার পরেও যেমন দিল্লিতে দ্রুত শাস্তি কার্যকর হয়েছিল, এই রাজ্যেও ঝুলন্ত ১৮টি পক্সো ও রেপ কেসের শাস্তি দ্রুত কার্যকর করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
আরজি কর কাণ্ড ও প্রশাসনিক কড়া পদক্ষেপ
আরজি কর প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, তৎকালীন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ১ বছর ধরে নথিপত্র চেপে রেখেছিলেন, যেখানে নতুন সরকার এসে মাত্র ৭ দিনের মধ্যে সিবিআই-কে নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট (NOC) প্রদান করেছে।
সন্দীপ ঘোষ, বিরূপাক্ষদের মেডিক্যাল লাইসেন্স বাতিল করা এবং কোনো আপস না করে তিন-তিনজন এডিজি (ADG) পদমর্যাদার আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করার সাহসী সিদ্ধান্তের কথা হাউসে পুনরুল্লেখ করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষে বিরোধী ও সরকারি পক্ষের বিধায়ক—যেমন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, ডঃ রাজেশ কুমার, দেবাশিস ধর, নওশাদ সিদ্দিকী প্রমুখের প্রতি ধন্যবাদ জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হুঙ্কার দেন: “আমরা কী করছি শুধু দেখতে থাকুন! পক্সো, ধর্ষণ বা মলেস্টেশন—আইনের শেষ সীমায় গিয়ে কীভাবে অপরাধীকে ধ্বংস করতে হয়, এই সরকার তা করে দেখাবে।”
(সম্পাদকমণ্ডলীর নোট: মুখ্যমন্ত্রীর এই ভাষণের পর রাজ্য রাজনীতি ও বিধানসভার অলিন্দে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। পুলিশি সংস্কারের এই প্রতিশ্রুতি রাজ্য প্রশাসনকে কতটা বদলাতে পারে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।)