
সৌরভ দত্ত, কলকাতা: অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের সামাজিক সুরক্ষা আরও জোরদার করতে বড় ঘোষণা করল রাজ্য সরকার। মঙ্গলবার নবান্নে আয়োজিত এক বিশেষ কর্মসূচিতে সাংবাদিকদের পেনশন দ্বিগুণ করার পাশাপাশি সাংবাদিক ও তাঁদের পরিবারের জন্য সারা দেশে বিনামূল্যে চিকিৎসার সুবিধার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রেস ক্লাবের প্রতিনিধি ও প্রবীণ সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের দেওয়া মাসিক ২,৫০০ টাকার সামাজিক সুরক্ষা ভাতা বাড়িয়ে ৫,০০০ টাকা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকেই বর্ধিত পেনশন কার্যকর হবে।
সাংবাদিক ও পরিবারের জন্য ৩৮ হাজার হাসপাতালে চিকিৎসা
সাংবাদিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বড় পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে। সাংবাদিক এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য সর্বভারতীয় স্তরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসার সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই সুবিধার আওতায় ‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনা’-র কার্ড হস্তান্তরের সূচনাও করা হয়।
সরকারের দাবি অনুযায়ী, রাজ্যের প্রায় ১,৯০০ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি দেশের প্রায় ৩৮,০০০ হাসপাতালে এই চিকিৎসা সুবিধা পাওয়া যাবে। এর মধ্যে AIIMS, ভেলোরের CMC, মুম্বইয়ের টাটা ক্যানসার হাসপাতাল, চণ্ডীগড় PGI এবং হায়দরাবাদের ড. রেড্ডির মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
আয়ুষ্মান ভারত থেকে বাদ পড়লেও মিলবে সুবিধা
নির্দিষ্ট শর্ত বা বয়সজনিত কারণে কোনও সাংবাদিক বা তাঁর পরিবারের সদস্য ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর আওতায় না এলে তাঁদের সরাসরি ‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনা’-র অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে।
এই পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করবেন তথ্য ও সংস্কৃতি সচিব ড. সৌমিত্র মোহন এবং স্বাস্থ্য সচিব নারায়ণ স্বরূপ নিগম। এ ক্ষেত্রে কোনও রাজনৈতিক বা মন্ত্রী পর্যায়ের সুপারিশের প্রয়োজন হবে না বলেও জানানো হয়েছে।

অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড না থাকলেও পেনশনের সুযোগ
বিগত সময়ে মাত্র ১৫০-১৫৪ জন অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিক মাসে ২,৫০০ টাকা করে সামাজিক সুরক্ষা ভাতা পেতেন। নতুন ব্যবস্থায় এই সুবিধার পরিধি আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে অসংগঠিত মাধ্যমে কাজ করা সাংবাদিক, নিউজ ডেস্কে কর্মরত সাংবাদিক এবং প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড না থাকা অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিকদেরও নির্দিষ্ট যোগ্যতার ভিত্তিতে ৫,০০০ টাকা মাসিক পেনশনের আওতায় আনার কথা জানানো হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য, বর্তমানের সীমিত সংখ্যক সুবিধাভোগীর পরিবর্তে যোগ্য আরও বেশি সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় নিয়ে আসা।
দুর্গাপুজোর আর্থিক সহায়তাতেও বড় পরিবর্তন
দুর্গাপুজো উপলক্ষে সাংবাদিকদের দেওয়া সরকারি আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের ঘোষণা করা হয়েছে। আগে কলকাতার সাংবাদিকদের ২,০০০ টাকা এবং জেলার সাংবাদিকদের ১,০০০ টাকা দেওয়া হত।
এখন থেকে কলকাতা ও জেলার মধ্যে এই বৈষম্য থাকছে না। আবেদনকারী সমস্ত যোগ্য সাংবাদিককে সমানভাবে ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
নতুন প্রকল্পের ১১টি গুরুত্বপূর্ণ দিক
১. ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে নতুন প্রকল্প কার্যকর হচ্ছে।
২. অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের মাসিক পেনশন ২,৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫,০০০ টাকা হচ্ছে।
৩. বিভিন্ন শ্রেণির সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের প্রকল্পের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৪. নিউজ ডেস্কে কর্মরত সাংবাদিকদেরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৫. প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড না থাকা সাংবাদিকদেরও নির্দিষ্ট যোগ্যতার ভিত্তিতে সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ রয়েছে।
৬. বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত সাংবাদিকদের অবসরের পর সামাজিক সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
৭. সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ানোই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।
৮. বর্তমান ২,৫০০ টাকার পেনশনের পরিবর্তে মাসিক ৫,০০০ টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
৯. নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করলে আরও বেশি সাংবাদিক এই প্রকল্পে আবেদন করতে পারবেন।
১০. নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১১. বর্তমানের সীমিত সংখ্যক সুবিধাভোগীর পরিবর্তে যোগ্য আরও বেশি সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকার বার্তা
অনুষ্ঠানে সংবাদমাধ্যমকে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করার আহ্বান জানানো হয়।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার বা দলের সমালোচনা গণতন্ত্রের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হলেও দেশপ্রেম ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সংবাদমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তাঁর বক্তব্য, সংবিধানে বাকস্বাধীনতার অধিকার থাকলেও ‘নেশন ফার্স্ট’ নীতি বজায় রাখা প্রয়োজন। দেশকে দুর্বল করে বা ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত করে—এমন শব্দ বা ভাষার ব্যবহার এড়িয়ে চলার আহ্বানও জানানো হয়।
সাংবাদিকদের সামাজিক সুরক্ষা, অবসরকালীন আর্থিক সহায়তা এবং চিকিৎসা পরিষেবাকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে নতুন এই উদ্যোগ সাংবাদিক মহলে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
#সাংবাদিক #সাংবাদিকপেনশন #সাংবাদিকদেরচিকিৎসা #স্বাস্থ্যবিমা #সামাজিকসুরক্ষা #কলকাতা #পশ্চিমবঙ্গ #নবান্ন #JournalistPension #JournalistHealthInsurance