📅   |   🕒   |   📍 কলকাতা   |   🔴 Breaking News
🔴 Breaking News : কলকাতার সর্বশেষ খবর এখানে দেখানো হবে।

বিধানসভায় পৌনে দু’ঘণ্টার মহাবিতর্ক, কলকাতার ভোলবদল থেকে ঘরে ঘরে জল—উঠল একাধিক পরিকল্পনা ও প্রশ্ন

নগর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্য দপ্তরের বাজেট আলোচনায় স্মার্ট কলকাতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জল জীবন মিশন নিয়ে বিস্তারিত রোডম্যাপ পেশ

নিজস্ব প্রতিনিধি, আমার কলকাতা:
কলকাতার নগর পরিকল্পনা থেকে শুরু করে রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকায় পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া—দুই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েই সরব হল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা। নগর উন্নয়ন ও পৌর বিষয়ক এবং জনস্বাস্থ্য কারিগরি (PHE) দপ্তরের বাজেট নিয়ে প্রায় পৌনে দু’ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনায় উঠে এল শহরের আধুনিকীকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল পরিষেবা এবং জল সরবরাহ ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

একদিকে যেমন ‘তিলোত্তমা’ কলকাতাকে আরও আধুনিক, সবুজ ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে, অন্যদিকে ‘জল জীবন মিশন’-এর বাস্তবায়ন, পানীয় জলের সমস্যা এবং অনিয়মের অভিযোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বিধানসভায়।

কলেজ স্ট্রিট হবে ‘অক্সফোর্ড স্ট্রিট’-এর আদলে

নগর উন্নয়ন দপ্তরের আলোচনায় কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কলেজ স্ট্রিটকে নতুন রূপ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা উঠে আসে। প্রস্তাব অনুযায়ী, বইপাড়াকে লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিটের আদলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পরিকল্পনায় রয়েছে—

  • নির্দিষ্ট অংশে ‘নো ভেহিকল জোন’ তৈরি
  • পথচারীদের জন্য উন্নত পরিবেশ
  • বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই পরিষেবা
  • বসার জায়গা তৈরি
  • ফুটপাতের বইয়ের দোকানগুলিকে আরও সুসংগঠিত করা

প্রশাসনের লক্ষ্য, ঐতিহ্য বজায় রেখেই কলেজ স্ট্রিটকে একটি আধুনিক সাংস্কৃতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।

বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরির পরিকল্পনা

শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। পচনশীল বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরি, মন্দির ও বাজারের ফুল থেকে ধূপকাঠি এবং আবির তৈরির মতো প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।

এছাড়াও জলাশয় পরিষ্কার রাখতে কচুরিপানা ব্যবহার করে হস্তশিল্প তৈরির উদ্যোগের কথাও আলোচনায় উঠে আসে।

বাড়ি বাড়ি আবর্জনা সংগ্রহ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করতে দেওয়া হবে QR কোড। সাফাই গাড়িতে থাকবে GPS প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে পৌরসভা জানতে পারবে কোন এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ হয়েছে।

‘স্বচ্ছ অ্যাপ’-এ অভিযোগ, দু’ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা

নাগরিক পরিষেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে চালু করা হচ্ছে ‘স্বচ্ছ অ্যাপ’। কোথাও আবর্জনা জমে থাকা বা জল জমার সমস্যা দেখা দিলে সাধারণ মানুষ ছবি তুলে অ্যাপের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারবেন।

অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

২০২৭-২৮ সালের মধ্যে ঘরে ঘরে জল পৌঁছানোর লক্ষ্য

জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে পানীয় জল প্রকল্প। ‘জল জীবন মিশন’-এর আওতায় ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে রাজ্যের প্রতিটি বাড়িতে পাইপের মাধ্যমে পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার কথা জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মত, শুধুমাত্র ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভর না করে নদীর জল পরিশোধনের মাধ্যমে সরবরাহ বাড়াতে হবে। এতে আর্সেনিক ও ফ্লোরাইডের মতো সমস্যাও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

জল জীবন মিশনে দুর্নীতির অভিযোগ, তদন্তের দাবি

আলোচনায় ‘জল জীবন মিশন’-এর কাজ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বিভিন্ন এলাকায় নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং ‘কল আছে, কিন্তু জল নেই’—এই অভিযোগগুলি নিয়ে সরব হন বিধায়করা।

অভিযোগগুলির যথাযথ তদন্ত এবং প্রকল্পের মান নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

আর্সেনিকমুক্ত জলের লক্ষ্যে বিশেষ উদ্যোগ

মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর ২৪ পরগনা-সহ আর্সেনিক প্রবণ এলাকাগুলিতে নিরাপদ পানীয় জল পৌঁছে দিতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

নতুন ল্যাবরেটরি, ফিল্টার প্ল্যান্ট এবং জল পরিশোধন প্রকল্পের মাধ্যমে সমস্যা মোকাবিলার পরিকল্পনা রয়েছে।

অনলাইনে বাড়ির নকশা ও মিউটেশন

পৌর পরিষেবায় স্বচ্ছতা আনতে বাড়ির নকশা অনুমোদন, মিউটেশনসহ একাধিক পরিষেবা অনলাইনে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ তাঁদের আবেদনের বর্তমান অবস্থা জানতে পারবেন।

গাছ প্রতিস্থাপন থেকে সোলার সিটি পরিকল্পনা

পরিবেশ রক্ষাতেও একাধিক পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। ঝড়ে উপড়ে যাওয়া পুরনো গাছ কেটে ফেলার বদলে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পুনরায় প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পাশাপাশি কলকাতার সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পালতা জলপ্রকল্প এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির প্রস্তাবও আলোচনায় আসে।

হুগলি রিভারফ্রন্ট প্রকল্পে জোর

গঙ্গার দুই পাড়কে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে হুগলি রিভারফ্রন্ট উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পর্যটন, বিনোদন এবং নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ বলে জানানো হয়েছে।

বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক তরজা

দীর্ঘ আলোচনায় শাসক ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতোরও দেখা যায়। কেন্দ্রীয় বরাদ্দ, রাজ্যের খরচের হিসাব এবং গত কয়েক বছরের কাজের খতিয়ান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

শেষ পর্যন্ত নগর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের জন্য ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শেষ হয়।

শেষ কথা

বিধানসভায় এই দীর্ঘ আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, কলকাতাকে আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি নাগরিক পরিষেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে জল জীবন মিশনের মতো বড় প্রকল্পগুলি কতটা কার্যকর ও স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top