📅   |   🕒   |   📍 কলকাতা   |   🔴 Breaking News
🔴 Breaking News : কলকাতার সর্বশেষ খবর এখানে দেখানো হবে।

পিয়ালি থেকে সমাজসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: নিঃস্বার্থ পথচলায় ‘বিনামূল্যের দোকান’ থেকে বৃদ্ধাশ্রমের স্বপ্ন

রঞ্জিত বর্মন, পিয়ালি:
​দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা সাধারণ এক তরুণ, যিনি একদা পেটের তাগিদে চলন্ত ট্রেনে হকারি করতেন— আজ তিনিই সমগ্র জেলাজুড়ে হাজারো প্রান্তিক মানুষের নিকট আস্থার শেষ আশ্রয়স্থল। নিজস্ব জমি ও ল্যান্ড ব্যবসার পাশাপাশি দক্ষিণ ২৪ পরগনার গ্রাম থেকে শহর— সর্বত্র নিরবচ্ছিন্ন সামাজিক কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছেন পিয়ালির এই পরিচিত মুখ। কুসংস্কারাচ্ছন্ন পরিবেশে শিক্ষার আলো জ্বালানো থেকে শুরু করে মরণব্যাধি ক্যানসারের চিকিৎসা— সর্বত্রই তাঁর উপস্থিতি উজ্জ্বল ও সমানভাবে সক্রিয়।
​সম্প্রতি ‘আমার কলকাতা’-র মুখোমুখি হয়ে তিনি ব্যক্ত করলেন নিজের অতীত সংগ্রাম, বর্তমান সামাজিক কর্মসূচি এবং ভবিষ্যৎ জীবনের এক পরম মহৎ আকাঙ্খার কথা।


​শিক্ষার আলো ছড়াতে ‘গদাধর পাঠশালা’
​স্মৃতির সরণি বেয়ে অতীতে ফিরে গিয়ে তিনি জানান, একসময় পিয়ালি ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া অনগ্রসর সম্প্রদায়ের শিশুদের মধ্যে শিক্ষার বিন্দুমাত্র আলো পৌঁছায়নি। সেই অন্ধকার দূর করার সংকল্প নিয়েই নিজের হকারির সামান্য রোজগার থেকে বই, খাতা এবং শিক্ষক এনে নিজ গৃহেই সূচনা করেছিলেন ‘গদাধর পাঠশালা’-র। কালক্রমে সেই ছোট্ট উদ্যোগই রূপ পরিগ্রহ করে ‘রামকৃষ্ণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’, ‘আলমা মাতের’ এবং অধুনা সফলতার সঙ্গে পরিচালিত ইংলিশ মিডিয়াম বিদ্যালয় ‘রামকৃষ্ণ একাডেমি’-তে।


আসন্ন শারদীয়ায় অভিনব উপহার: পিয়ালি স্টেশনে ‘বিনি পয়সার দোকান’
​আসন্ন দুর্গাপূজায় দুঃস্থ ও অনগ্রসর মানুষদের মুখে হাসি ফোটাতে এক অনন্য ও যুগান্তকারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন তিনি। পিয়ালি স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে এক ‘বিনি পয়সার দোকান’।


​উদ্যোক্তার ভাষায়,


​”বহু মানুষের ঘরেই এমন অনেক পোশাক অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে, যা আর পরা হয় না। আমরা সেই সব বস্ত্র সংগ্রহ করছি। যাঁদের নতুন বস্ত্র কেনার সমর্থ্য নেই, তাঁরা সম্পূর্ণ নিখরচায় নিজের পছন্দমতো পোশাক এখান থেকে বেছে নিতে পারবেন। প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকবে এই কেন্দ্র। যাঁরা পোশাক দান করতে আগ্রহী, প্রয়োজনে তাঁদের বাড়ি থেকে নিজস্ব যানবাহনে পোশাক নিয়ে আসার ব্যবস্থা থাকবে।”


স্বাস্থ্য ও সার্বিক কল্যাণে নানামুখী উদ্যোগ
​সামাজিক কর্মযজ্ঞের প্রভূত অর্থসংস্থান কোথা থেকে আসে— এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি নিঃসঙ্কোচে জানান, তাঁর ল্যান্ড বিজনেস, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ওষুধের দোকান ও চায়ের ব্যবসার লভ্যাংশের একটি বড় অংশই তিনি ব্যয় করেন আর্তজনের সেবায়। ইতিমধ্যে ৮টি মন্দির নির্মাণে সাহায্যের পাশাপাশি প্রতি বছর বহু দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীকে বৃত্তি প্রদান ও শিক্ষা-সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি।


এছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য সামাজিক কাজের মধ্যে রয়েছে:


​বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা: প্রতি রবিবার নিখরচায় চিকিৎসক পরামর্শ ও ওষুধ প্রদান এবং প্রতি মাসের প্রথম রবিবার বিনামূল্যে চোখের ছানি অপারেশন ও চশমা বিতরণ।


ক্যানসার নির্ণয় ও টিকাকরণ: চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে বহু নারীর সার্ভাইক্যাল ক্যানসার স্ক্রিনিং এবং ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সি বালিকাদের বিনামূল্যে এইচপিভি (HPV) টিকাকরণ।


যক্ষ্মারোগীদের পুষ্টিকর খাদ্য: স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে যক্ষ্মাক্রান্তদের দ্রুগ সুস্থতার লক্ষ্যে প্রতি মাসে পুষ্টিকর খাদ্যসামগ্রী প্রদান।


জমি ক্রয়ে বিশেষ সম্বল সুরক্ষা: বয়সের শেষ প্রান্তে থাকা মানুষের জমানো মূলধনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১০০ মাসের বিশেষ কিস্তি ও ১০০% রিটার্ন পলিসির সুসংগঠিত পরিকল্পনা।


রাজনীতির ঊর্ধ্বে সমাজসেবা
​রাজনৈতিক আবহাওয়া কিংবা শাসকদলের পরিবর্তনের প্রভাব তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ডে কোনোদিন প্রতিফলিত হয়নি। বামফ্রন্ট কিংবা তৃণমূল— সব সরকারের আমলেই তিনি সমস্ত স্তরের নেতৃত্বের কাছ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা লাভ করেছেন। কারণ, তাঁর একমাত্র সুনির্দিষ্ট পরিচয়— তিনি একজন অনুগত ‘সমাজসেবী’। এছাড়া জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ (DLSA)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে শিশু ও নারী সুরক্ষাতেও তিনি অবিরাম কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।


​শেষ স্বপ্ন: রামকৃষ্ণ মন্দির ও বৃদ্ধাশ্রম
​ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রসঙ্গ উঠতেই কিঞ্চিৎ আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন এই কর্মযোগী। জানান, জীবনের শেষ সোপানে এসে তাঁর একমাত্র লালিত স্বপ্ন— একটি বাৎসরিক বৃদ্ধাশ্রম এবং শ্রীরামকৃষ্ণের একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করা। সমাজ থেকে অবহেলিত, একাকী প্রবীণ মানুষদের পাশে থেকে জীবনের অবশিষ্ট সময়টুকু তাঁদের সেবায় নিয়োজিত করাই তাঁর জীবনের চরম ও পরম প্রাপ্তি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top