📅   |   🕒   |   📍 কলকাতা   |   🔴 Breaking News
🔴 Breaking News : কলকাতার সর্বশেষ খবর এখানে দেখানো হবে।

নান্দীরঙ্গ-এর নাটক আবু হোসেন ——রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিঘাত, নাকি প্রাণ-এর আহ্বান !?

গিরিশচন্দ্র ঘোষের কালজয়ী নাটককে নতুন ব্যাখ্যায় মঞ্চে আনলেন নির্দেশক তিতাস ঠাকুর। প্রেমাঞ্জন দাশগুপ্তের কলমে উঠে এল প্রযোজনার অভিনয়, সঙ্গীত ও নির্মাণশৈলীর বিশদ মূল্যায়ন।

কলমে: প্রেমাঞ্জন দাশগুপ্ত

লেখাটির যবনিকা উন্মোচনে আবু হোসেন নাটক নিয়ে ক’টি কথা বলি। আবু হোসেন নাটকটির মূল রচয়িতা নাট্যাচার্য গিরিশ চন্দ্র ঘোষ, রচনাকাল ১৮৯৬। সময়টি ভাবুন —- সুশিক্ষিত বাবু সমাজ। ব্রাহ্মণই সমাজে শেষ কথা বলে। বস্তুত, নিয়ামক। এমন একটি পটভূমিতে দাঁড়িয়ে গিরিশবাবু লিখছেন নাটক আবু হোসেন। আরব্য রজনী (The Arabian Nights) থেকে বেছে নিচ্ছেন এমন একটি গল্প, যে গল্পে নায়ক তথা Central Character তথা Protagonist এক ক্ষৌরকার (নাপিত) যে কিনা একরাতের জন্য বাগদাদের বাদশাহ হয়। Literary Device অর্থাৎ শৈল্পিক হাতিয়ার হিসেবে গিরিশবাবু বেছে নেন Romantic Comedy অর্থাৎ রোমান্টিক কৌতুক। শোনা যায়, প্রথম মঞ্চায়নেই দর্শকের মধ্যে হাসির রোল ওঠে, থেকে থেকেই, বারে বারে। শুধু ভাবুন, আরব্য রজনীর ছদ্মবেশে আর হাস্যকৌতুকের আভরণে নাট্যাচার্য ভাবিয়ে তুলেছিলেন বাংলার শিক্ষিত সমাজকে। সেইসঙ্গে, কষিয়ে এক চড় বসিয়েছেন তদানীন্তন ব্রাহ্মণ্যবাদের গালে।

পরবর্তীতে, Third Theatre তথা সমান্তরাল নাট্য – এর অন্যতম প্রবক্তা, আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান বাদল সরকার – এর চোখে পড়ল আবু হোসেন। স্বতঃপ্রণোদিত বাদল সরকার – এর কলমের আঁচড়ে, পরিমার্জনে ঐ Romantic Comedy নতুন মননে হয়ে উঠল এক Slapstick Comedy বা Farce অর্থাৎ এক কথায় এক অনন্য ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্বক কৌতুক। গিরিশবাবুর লেখা নাটক তাহলে কি ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক ছিল, ভাবুন। অস্বীকার করা যায় না, গিরিশবাবুর চড় রূপান্তরিত হয় থাপ্পড় – এ, অর্থাৎ আরও জোরে, সজোরে। বাদল সরকার- এর এ নাটক প্রথম মঞ্চস্থ হয় একাদেমিতে, সাল ১৯৭২, ৯-ই ফেব্রুয়ারি।

এমন একটি নাটককে আজ তথা সাল ২০২৬ – এ যে বা যারা যখন মঞ্চায়নের কথা ভাবেন, প্রাসঙ্গিকতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখান, তখন সে/তাদের প্রতি প্রথমেই একটা শ্রদ্ধা জন্মায়।

রাষ্ট্রযন্ত্র কিই না করতে পারে! —– দাদাগিরি, ঘোমটার নিচে খেমটা নাচ, দুর্বলের ওপর অকথ্য অত্যাচার কিংবা সাধারণ কিংবা গরিব-বোকা-শ্রমিক শ্রেণী (Proletariat class) – কে বাঁদর নাচন নাচানো।

একটি মজার বিষয় হ’লো, গিরিশবাবু ও বাদলবাবু দুজনেই হয়তোবা সহজ উপস্থাপনার কথা ভেবে অথবা Arabian Nights – এর মূল মূর্ছনার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নাটকটি সঙ্গীত নির্ভর তথা lyrical আঙ্গিকে বেঁধেছিলেন।

নান্দীরঙ্গ-ও সে পথেই হাঁটলো। সরল-সোজা স্বীকারোক্তির বিনিময়ে প্রথম অংকের যৎকিঞ্চিৎ পরিমার্জন করে উপস্থাপন করল নাটক আবু হোসেন —– এক কথায় এক অনবদ্য প্রযোজনা। (তারিখ : ৪ জুলাই ২০২৬ , একাদেমি)

বর্ণে-গন্ধে-ছন্দে-গীতিতে নান্দীরঙ্গ-এর আবু হোসেন তখন একাদেমি প্রেক্ষাগৃহ ভরিয়ে তুলেছে । আবুর মনকষ্ট অচিরেই দর্শকের মন-ব্যাথা হয়ে উঠেছে। ভেসে চলেছি আমরা আবুর সাথে এক বিরল অথচ আবেশিত এক অনন্ত যাত্রায়। এ যাত্রা সাধারণ মানুষের —– যুগ যুগ ধরে এই অনন্তের হদিস করে আসছে সাধারণ —– এ তো সুন্দরের খোঁজ, প্রশান্তির খোঁজ —– খোঁজ সৃষ্টি-সৃজনের।

প্রতিটি অভিনেতার (স্ত্রী-পুরুষ উভয়ই) দীপ্ততা, সাবলীলতা, আধুনিকতা, চরিত্র হয়ে উঠে নিজেকে প্রকাশ করা, বলা ভালো, চরিত্রটিকে বিকশিত করার ব্যাকুলতা তথা আর্তি মন ভরিয়ে দেয়।

মাঝে মধ্যে নিজের চোখ-কান – কে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না —– কি করে একটি দলে এতোজন অভিনেতা গান গাইতে পারে!

বিশেষত, শুভঙ্কর ভট্টাচার্য ও মৌ রায় চৌধুরী যখন একেকটি বন্দিশ বা কোনো একটি কলি ধরছেন, আমার মতোই সারা প্রেক্ষাগৃহ বাহ্/কেয়া বাত্ বলে উঠছেন স্বতস্ফূর্তভাবে। সুবীর সান্যাল – এর মতো প্রজ্ঞাবান সঙ্গীত সাধক-এর সহ-সঙ্গীতশিল্পী সৌদীপ চক্রবর্তী, নীলার্ঘ্য দত্ত, শ্রীনাথ মুখার্জী, কন্ঠে ঋতম্ভরা ঘোষ ও অথৈ বসু একত্রে যেন এক মায়াবী মৌতাত সৃষ্টি করেন।

হারুন আল রশীদ চরিত্রে সুমন সিংহ রায়- এর বাহুল্যবর্জিত, মাপা অভিনয়, স্বরক্ষেপন তাক লাগিয়ে দেয়। বৃদ্ধ বাদশাহর ভূমিকায় শুভঙ্কর ভট্টাচার্য অদ্বিতীয়। মঞ্চে ও মঞ্চের বাইরে দর্শকের মাঝে ওঁর দীপ্তমান পদচারণা ও সংলাপ প্রক্ষেপণ (Dialogue Deliverance) বেশ নজরে আসে। প্রবীণ অভিনেতা দীপক দাস দুটি চরিত্রে কি অভূতপূর্বভাবে দুটি চরিত্রই স্বকীয় করে তোলেন। অরূপ বন্দোপাধ্যায় তিন-তিনটে চরিত্র চিত্রিত করেন অনবদ্য দক্ষতায়।রোশেনা চরিত্রে মৌ রায় চৌধুরী নাচ-গান-অভিনয় —– সবকটির এক দূর্লভ মিশেল, যা সম্মোহিত করে রাখে সারাক্ষণ। আমার ঠাকুমা বলতেন —– এ মেয়ে হাতে, মুখে, রথে….। মৌ এ নাটকে এ প্রবাদের সমার্থক।

এছাড়াও অভিনয়ে বিশেষভাবে দাগ কেটে যান লিপি লাহা, সুকান্ত শীল, শুভদীপ ধারা, ঈশিকা শ্রীবাস্তব প্রমুখ। সভাপতির ভূমিকায় অনিন্দম গুহ (কাঞ্চন) সামান্য সময়ের জন্য মঞ্চে এলেও বেশ বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন এক পোড়খাওয়া অভিনেতার স্বরূপ।

আবু হোসেন-এর চরিত্রে সপ্তর্ষি ভৌমিক অসমান্তরাল। সাত্ত্বিক ও শরীরি অভিনয়শৈলীর এক দূর্লভ মিশেল। এ নাটকে ওঁর অভিনয় যেন একটি মিউজিয়ামে প্রবেশ —- অমূল্য মণিমানিক্য যেন যথেচ্ছ ছড়ানো আপনারই আসার আশায়। অসম্ভব ক্ষমতাবান এক অভিনেতা। মুহুর্তেই আবিষ্ট করে দর্শককে সম্মোহিত করে নিয়ে চলতে থাকেন এক অভূতপূর্ব, অনন্য, অনন্ত যাত্রায়! ভাবি, টেলিভিশনে র বাংলা অধিকাংশ ধারাবাহিকগুলির প্রধান/কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্রে যে বিকৃত, অর্ধশিক্ষিত, দেহসর্বস্ব প্রাণী দেখি, তার পরিবর্তে এমন বলবান অভিনেতা থাকলে কি দাঁড়াতো ! ……… হায় হতস্মি!

মঞ্চে বিলু দত্ত, আলোয় সাধন পাড়ুই, আবহে শুভজিৎ দাস, নামাঙ্কনে বিদিশা ভড় ও রূপসজ্জায় শেখ ইসরাফিল (এপ্রিল) অনবদ্য, বড়ো ভালোবেসে কাজ করেছেন সকলেই।
পরিশেষে বলি, কুর্নিশ নির্দেশক তিতাস ঠাকুর-কে এমন একটি অনন্যসাধারণ প্রযোজনা বাংলার দর্শককে উপহার দেওয়ার জন্য! প্রতি পলে পলে তিতাস- এর দূরদর্শীতা, সৌকর্য, নন্দনতত্ত্বের সঠিক নির্বাচন ও বিনির্মাণ অনুভব করা যায়।

সুবিখ্যাত নাটককার শ্রদ্ধেয় মোহিত চট্টোপাধ্যায় বলতেন —- পৃথিবীতে যা কিছু সুন্দর, তার কাছাকাছি যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো পদযাত্রা নেই।

নান্দীরঙ্গ তিতাস – এর হাত ধরে সকলকে নিয়ে এক সুন্দরকে আপনাদের সামনে এনেছে। ওঁরা যে সবাই অপেক্ষমান আপনার পরশের! ……… জনাদেশের!

1 thought on “নান্দীরঙ্গ-এর নাটক আবু হোসেন ——রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিঘাত, নাকি প্রাণ-এর আহ্বান !?”

  1. Titas Bandyopadhyay Thakur

    আন্তরিক ধন্যবাদ @প্রেমাঞ্জন দাশগুপ্ত .. সম্মানিত বোধ করছি। একটা যে কোনো আর্ট ফর্ম কে তিল তিল করে গড়তে হয়, অনেক অধ্যবসায়, পরিশ্রম, অনেক মানুষের সম্মিলিত প্রয়াস আর একটা লম্বা সফর… সেটার প্রথম শর্ত হলো, ভরতের নাট্যাশাস্ত্র মেনে, বিনোদন আর তারপর উপদেশ প্রদান….
    তাই দর্শক যখন এ নাটক দেখে স্বতঃস্ফূর্ত ভালোলাগায় ভেসে নিজেকে এ নাটকের অংশ করে নেন, তখন আমাদের নির্মাণ সার্থক হয়। আর সে ভাবনার প্রতিফলনই রয়েছে @প্রেমাঞ্জন দাশগুপ্তর এই সমালোচনার প্রতি ছত্রে…
    আপনার এ স্বীকৃতি আমাদের ঝুলির এক অমূল্য রতন, এগিয়ে যাওয়ার পাথেয়। থিয়েটার ছুঁয়ে থাক আমাদের জীবন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top